প্রসঙ্গ: বিশিষ্ট আউলিয়া হিসেবে হিটলারের উত্থান!

Posted: July 14, 2014 in ব্লগ
Tags: , , , ,

লিখেছেন জাহিদ রাজন

দেশের গ্রাম গঞ্জে একটা অন্যতম বড় বিনোদন হল চোর পেটানো। চোর ধরতে পারলে তার হাত পা বেঁধে তাকে গাছের সাথে ঝুলিয়ে তাকে পৈশাচিক কায়দায় পেটানো হয়। সাথে বিভিন্ন রকমের ক্রিয়েটিভ পৈশাচিক কায়দা যোগ হতে পারে। যেমন গায়ে পিঁপড়া ছেড়ে দেয়া, পানি খেতে না দেয়া ইত্যাদি। গ্রামের বিশিষ্ট খারাপ লোক এই ব্যাপারে থাকবে অগ্রগণ্য, কারণ সে মানুষ হিসেবে নিজে খারাপ। তার ভালত্ব জাহির করার এটা একটা প্রক্রিয়া। আমি চোর পেটানো অবস্থায় আকর্ণ বিস্তৃত হাসিতে ফেটে পড়তে দেখেছি আবাল বৃদ্ধ বণিতা সবাইকে। এটা যেন একটা মেলা। এখান থেকে মজা এক বিন্দু কম নিয়ে সে আইমেক্স এ জেমস বন্ডের সিনেমা মিস করতে চায় না।

এই মেন্টলিটি কন্সটেন্ট। ঘটনার ভিন্নতায় এটা মাঝে মাঝে জেগে উঠে। এর সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে যে বিশিষ্ট আউলিয়ার প্রতি বাঙালি জাতির শ্রদ্ধা উথলে উঠেছে তার নাম হিটলার। ফিলিস্তিন ইস্যুতে হিটলার সাক্ষাত পয়গম্বর। কারণ তিনি ইহুদি মারতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই না এই পুণ্যাত্না নাকি অল্প কিছু ইহুদী রেখেও গেছেন নিজের কাজকে ভেলিডেট করতে। তিনি নাকি বলে গেছেন- ” আমি চাইলে সব ইহুদীদের হত্যা করতে পারতাম,কিন্তু কিছু ইহুদী বাচিয়ে রেখেছি,এই জন্যে যে,যাতে পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারে,আমি কেন ইহুদী হত্যায় মেতেছিলাম”। অতএব, ইহুদী হত্যা বিশেষ পুণ্যের কাজ। এই পুণ্যে বাঙালি ভাগ চায় এই উক্তি প্রচার করে। ফিলিস্তিনের ভাইদের প্রতি আপাতত এটাই তার কর্তব্য।

হিটলার সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলার প্রয়োজন নাই। এতটুকু বলাই যথেস্ট যে এই লোক ছিল একজন সাইকোপ্যাথ যে মানুষ হত্যায় মেতেছিল। যার মানুষের চুল দিয়ে যার কাপড় বানানোর শখ হয়, যে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা করে সে একটা ঘৃণ্য পশু। তার পশুত্বের তুলনায় পশুরাও নিজদের পারফরম্যন্সে লজ্জিত হবে। এই পশুর পাশবিক উক্তিতে বাঙালি মজা পায়, ঠিক চোর পেটানোর মত করে।

ইসরাইলের লোকেরা ইহুদী এবং আল্লাহ কোরআনে তাদেরকে অভিশপ্ত বলেছেন। আল্লাহ কি এদের সবাইকে দলমত নির্বিশেষে হত্যা করতে বলেছেন ? আল্লাহর রাসুল কি এদের সবাইকে গণহারে হত্যা করেছেন ? তিনি কি মাংসে বিষ প্রয়োগকারিণী ইহুদী মহিলাকে ক্ষমা করে দেন নি ? তিনি কি তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেন নি ? বাঙ্গালির এই সফিস্টিকেটেড ইসলাম বুঝার সময় কই ? শিক্ষিত ইংরেজি জানা মানুষ গণহারে ইহুদী হত্যার বর্বরতায় সমর্থন দেয়। বলে ইশ ! হিটলার যদি কাজটা শেষ করে যেত ? আমি এই লোকগুলোকে হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের পাশে দাত কেলিয়ে হাস্যরত দেখতে পাই। এরাই যদি ইসরাইলি হত তাহলে আজকে যেই ফিলিস্তিনি ভাইদের জন্য এত দরদ তাদেরকে এরকম করে হত্যা করে চোর পিটানোর মজা নিত।

একটা জিনিস পরিস্কারভাবে জেনে রাখা দরকার, ইসলাম যে কোন মানুষকে বিনা অপরাধে কিংবা তার ধর্মের অন্য কারও অপরাধে হত্যা সমর্থন করে না এবার তার ধর্ম যাই হোক না কেন। হিটলারের মত সাইকোপ্যাথের কাজকে সমর্থন দেয়া এক ধরনের মানসিক রোগ। অনেকের ক্ষেত্রে এটা অজ্ঞতা বা মূর্খতা, যে মূর্খতার নিচে তার মনুষ্যত্ব চাপা পড়ে যায়। এই মূর্খতার কারণে সে রাস্তার পাশে চোর নির্যাতনের পৈশাচিক কাহিনী দেখে আইমেক্স এ স্কাইফল সিনেমা দেখার মজা পায়।

একটা অন্যায় কাজ দিয়ে আরেকটা অন্যায়কে ঠিক করা যায় না । অতএব, আমরা ঠিক তেমনভাবেই ইহুদী হত্যাকে ঘৃণা করি ঠিক যেমনটা আজকেই নিরপরাধ ফিলিস্তিনের মানুষ হত্যাকে ঘৃণা করি। আমরা মুসলিম হিসেবে সকল মানুষের জীবনকে পবিত্র জ্ঞান করি।

কোরআনে আল্লাহ বলেছেন- “এ কারণেই আমি বনী-ইসলাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবাপৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে” ।

” থিঙ্ক গ্লোবালি এন্ড এক্ট লোকালি”- এরকম একটা কথা আছে। ফিলিস্তিন নিয়ে দোয়া,চেষ্টা এবং অর্থ সাহায্য সবই ঠিক আছে, করা খুব দরকার। তবে পাশের অভুক্ত মানুষটার কথা আগে মনে রাখা দরকার। বাসার কাজের লোকজনের সাথে ভাল আচরণের কথা মনে রাখা দরকার। ইউরোপ আমেরিকায় লোকজনের বাসায় কাজের লোক নাই (উপমহাদেশের কিছু জমিদার এম্বাসীর কর্মকর্তা ছাড়া)। একটা লোক সারা দিন অন্যের বাসায় কাজ করবে,সে পড়াশুনা করবে না বা নিজের মত করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে না এটা দুঃখের কথা। আমাদের দেশে হয়ত কিছু করার নাই। আমরা গরীব মানুষ। আর কিছু না হোক এদের সাথে ভাল আচরণ করা যেতে পারে। বাইরে কেতাদুরস্ত অনেক লোকের বাসায় গেলে এবং বাসার কাজের লোকেদের সাথে তাদের আচরণ দেখে বুঝা যায় তারা আসলে কতটা ভদ্র !

ফেসবুকের আবেগ অনেক সহজ। এর চেয়ে সত্যিই কিছু মানুষকে সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে এ ধরনের কথাবার্তা প্রচার থেকে বিরত থাকা উচিত। যে কোন বিবেকবান মানুষের অবস্থান হবে ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে এবার সত্যের পক্ষে বা বিপক্ষে যেই অবস্থান করুক না কেন।

হিটলার এবং তার উক্তি ঘৃণ্য এবং পরিত্যজ্য কেননা এটা ন্যায় পরিপন্থী !

Advertisements

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s