বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিন সম্পর্ক

Posted: July 20, 2014 in নিবন্ধ
Tags: , ,

লিখেছেন প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনির হোসেন

Yasir-arafat-with-president-bangabandhuগাজায় চলছে ইসরাইলি বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ । উড়ে এসে জুড়ে বসা নেতানিয়াহুরা বিশ্বজনমত উপেক্ষা করে নির্বিচারে মুসলিম নারী ও শিশু হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে।

গত কয়েক দিনে নেতানিয়াহুর সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিক্ষিপ্ত গোলার আঘাতে নিহত হয়েছেন কয়েক শত নিরীহ ফিলিস্তিনি নারী ও শিশু।

নতুন করে এই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের আগুন জ্বললেও নেতানিয়াহু হুঙ্কার দিয়ে বলেছেনঃ ‘আমাদের এই ধারা অব্যাহত থাকবে’।

ফিলিস্তিন অধিকৃত গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।

এছাড়া গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অনতিবিলম্বে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি জানায় বাংলাদেশ।

গত ১১ জুলাই রোজ শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতা ও জীবননাশী সহিংসতার ঘটনায় বাংলাদেশ গভীরভাবে মর্মাহত। বিমান হামলায় মর্মান্তিকভাবে বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে হুমকি সৃষ্টি করেছে।

ইসরায়েলের এ আগ্রাসনের কঠোর নিন্দা জানিয়ে গাজায় বেসামরিক লোকজনের ওপর নৃশংসতা বন্ধে উভয়পক্ষকে সর্বোচ্চ সহনশীলতা প্রদর্শনের আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।

আরব অঞ্চলের শান্তি পরিকল্পনা ও রোডম্যাপ অনুযায়ী ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে জাতিসংঘ গৃহীত প্রস্তাবনার সঙ্গে বাংলাদেশ একমত পোষণ করে। এজন্য চলমান সমস্যা সমাধানে আগের মতো শান্তি প্রক্রিয়া পুনর্জীবিত করার লক্ষ্যে সংলাপে বসার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করে ইসরায়েল কর্তৃক প্যালেস্টাইনি ভূমি দখল অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং রাজধানী পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র পাবে ফিলিস্তিনি জনগণ।

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের দশ দিনব্যাপী হামলা চালিয়ে নির্বিচারে শিশুসহ নিরীহ মানুষ হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ। গত ১৪ জুলাই রোজ সোমবার এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি এই নিন্দা জানান।

বিরোধীদলীয় নেতা, ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে ওআইসি, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ সৃষ্টি করারও আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনি জনগণের জানমাল রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই ধরণের নির্মম হামলা বিশেষ করে সিয়াম সাধনার মাসে বিশ্ববাসীর কাম্য নয়।

তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলিদের এ নির্মম গণহত্যা বিশ্ববাসীর সঙ্গে আমরাও হতবাক। এখনই এ হামলা ও গণহত্যার ইতি টানা হোক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ১২ জুলাই সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছেন: ‘ফিলিস্তিনিদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের দাবিকে ধ্বংস করার জন্যই সমস্ত হিংস্রতা দিয়ে এই সামরিক আক্রমণ চালানো হচ্ছে’৷

তিনি আরও উল্লেখ করেন: ‘আমি গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের এহেন সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি৷ অবিলম্বে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর বর্বরোচিত হামলা বন্ধের জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি৷ ইসরায়েল যদি তার আগ্রাসী মনোভাব বরাবরের মতো অব্যাহত রাখে তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে কখনোই শান্তি ফিরে আসবে না’।

ফিলিস্তিনিদের উপর বর্বরোচিত অমানবিক, বীভৎস বিমান ও মর্টার হামলা বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

bangladeshi-fighter-for-palestineগত ১২ জুলাই, দলের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘জাতিসংঘ কূটনীতিক তৎপরতা চালালেও তাতে তেমন কোন অগ্রগতি না হওয়া বিশ্ব শান্তির জন্য এক অশনিসংকেত। তাছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক মহলের আহ্বান উপেক্ষা করে এই হামলা অব্যাহত রাখার যে ঘোষণা ইসরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধান দিয়েছেন তা বিশ্বের শান্তি রক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ।’

বিবৃতিতে তিনি অবিলম্বে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই বর্বোরোচিত হামলা বন্ধের দাবি জানান।

সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘গত পাঁচদিন যাবৎ ইসরায়েলীরা ফিলিস্তিনিদের গাজা উপত্যক্যায় বিমান ও মর্টার হামলা অব্যাহত রেখেছে। শনিবার দুটি মসজিদে, দাতব্য প্রতিবন্ধী কেন্দ্রসহ বেশ কয়েক জায়গায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলীরা। হামলায় এ পর্যন্ত ১২৪ জন মৃত্যুবরণ করেছে, আহত হয়েছে শিশু ও নারীসহ ৭৫০ জনেরও বেশি।’

তিনি বলন, ‘অব্যাহত হামলার কারণে ফিলিস্তিনের গাজায় এখন মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। যা বিপন্ন মানবতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে। ঐ এলাকার জনগণ আরো হামলার ভয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে খোলা জায়গায় অবস্থান করে মানবেতর ও আতংকের মাঝে দিনাতিপাত করছে। হাসপাতালগুলো লাশের সারি আর আহতদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে। যা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘গতকাল গাজা শহরের পার্শ্ববর্তী তুফাহর পূর্বাঞ্চলে সর্বশেষ হামলায় ৩ জন নিহত হয়। এর আগে উত্তরাঞ্চলের বেইত লহিয়ায় প্রতিবন্ধী বিষয়ক একটি দাতব্য সংস্থায় এ হামলায় ২ জন নিহত হয়। শহরের পশ্চিমাঞ্চলে হামলায় ৩ জন নিহত হয়। গাজায় দুটি মসজিদ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সিয়াম সাধনার মাসে এই ধরনের বর্বরোচিত হামলা বিশ্ববাসীর কাম্য নয়। ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরায়েলীদের এহেন বর্বরোচিত হামলায় বিশ্ববাসীর সাথে বাংলার জনগণও হতবাক।’

সম্প্রতি ফিলিস্তিনির গাজা উপত্যক্যায় ইসরায়েলীদের হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং ফিলিস্তিনিদের উপর বর্বরোচিত হামলা বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার আহ্বান জানান সৈয়দ আশরাফ।

ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও পারিবারিক বৈরিতাকেন্দ্রিক বাংলাদেশি রাজনীতিতে বহুদিন পর একধরনের রাজনৈতিক মতৈক্য দেখা যাচ্ছে। সরকারের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিবৃতি, বিএনপি’র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, বিরোধীনেতা জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ এবং বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি থেকে শুরু করে, ডানপন্থী ইসলামী দলগুলো সবাই, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক হামলার নিন্দা জানিয়ে ফিলিস্তিনের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো দলই তাদের বিদেশি বন্ধুরা তুষ্ট হবে কি না, সেই উদ্বেগের কারণে নিশ্চুপ থাকেনি।

গাজায় ইসরাইলের বোমা হামলায় নিহত-আহতদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে রয়েছে শিশু ও নারী। সারে সারে কফিন দিয়ে মোড়ানো শিশুদের লাশ সারা দুনিয়ায় মানুষের বিবেককে আহত ও সংবেদনা জাগ্রত করেছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। মানুষ নিন্দা জানাচ্ছে নানান ভাবে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

কিন্তু ‘গাজায় হত্যা বন্ধ কর’, ‘শিশু হত্যা বন্ধ কর’, ‘Stop Killing in Gaza’, ‘Stop Killing Children’, এইসব প্লাকার্ড হাতে বাংলাদেশে এবং বিভিন্ন দেশের মানবিকতা সম্পন্ন মানুষ শ্লোগান দিয়ে শহরের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাজার চেঁচামেচি করলেও ইসরাইল বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করবে না, করছে না, এবং তাদের বোমা মারাও থামবে না। অতীতেও ইসরাইল তোয়াক্কা করে নি, এখনও করছে না।

বাংলাদেশের সাধারণ জনগন এবং সরকার প্রথম থেকেই সর্বদা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণকে বাংলাদেশী সরকার ও জনগন সবসময় সম্মানের চোখে দেখে।

মজার ব্যাপার হল: বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী দেশটির নাম হচ্ছে ইসরাইল। নিঃসন্দেহে এটি একটি বিস্ময়কর ঘটনা । আরো বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে ইসরাইল বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে একবার নয়, দুই দুই বার।

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কাছে ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল তারিখে বাংলাদেশকে স্বীকৃতির চিঠি পাঠায় ইসরাইল। স্বীকৃতির সাথে সাথে ছিল যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য সমরাস্ত্র সরবরাহ করার অঙ্গীকার। বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার প্রয়োজন সত্ত্বেও ইসরাইলের সেই স্বীকৃতি গ্রহণ করেনি। সমরাস্ত্র সাহায্যের প্রস্তাবও ঘৃণাসহ প্রত্যাখান করে। যুদ্ধের সময়েও বাংলাদেশ সরকার ফিলিস্তিনি ভাইদের পাশে থেকে সরে দাঁড়ায় নাই।

দ্বিতীয়বার তারা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় ১৯৭২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে। ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদকে তারবার্তার মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান করে।কিন্তু বঙ্গবন্ধু ইসরাইলের স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান নেতা ইয়াসির আরাফাতকে নিজের ও বাংলাদেশের চিরকালীন বন্ধু হিসেবে বরণ করে নেন।

বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় থেকে সব সরকারের আমলে ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও বুয়েটসহ সব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও কূটনীতিকদের অত্যন্ত সম্মানজনকভাবে বরণ করা হয় বাংলাদেশে।

bangladesh-palestine-postalবাংলাদেশের একটি খুদ্র রাষ্ট্র হয়েও বিশ্বের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে অস্বীকার করতে পারলেও মিশর, তুরস্কের মতো মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মুসলিম দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে ইসরাইলের সাথে, যা দুঃখজনক ঘটনা।

বাংলাদেশ অন্যান্য মুসলিম দেশের মতো প্রথম থেকেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এর পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ও ইসরাইল উভয় দেশ World Trade Organization‎( WTO ) এর সদস্য হওয়ার সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র দেশ, যার সাথে ইসরাইলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, যে কোন প্রকারের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। ইসরাইলের সাথে বাংলাদেশের কোন প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্কও নাই। বাংলাদেশের পাসপোর্টে পরিষ্কার করে লেখা থাকেঃ ‘ALL COUNTRIES OF THE WORLD EXCEPT ISRAEL’

ফিলিস্তিনের সাথে বাংলাদেশ সম্পর্ক অনেকটা জন্মের পর থেকেই। গোঁয়ার এবং অত্যাচারী পাকিস্তানের শাসকদের সাথে রাজনৈতিক মতবিরোধ এবং ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়া,ভারতসহ অন্যান্য দেশের সাহায্য নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে গোটা মুসলিম বিশ্ব সহজভাবে নেয়নি এবং আরবরা স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতেও অনীহা প্রকাশ করে ।

স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক এবং তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই অচলাবস্থা কাটানোর উদ্যোগ নেন। এরই অংশ হিসেবে ‘ওআইসি’সহ আরব দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে মনযোগ দেন তিনি।

আরবদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায় বাংলাদেশের ব্যাপারে, যখন ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিশর-সিরিয়া-ফিলিস্তিন অক্ষের প্রতি প্রকাশ্য জোরালো সমর্থন ঘোষনা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এসময় যুদ্ধে সেবা দেবার জন্য তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি মেডিকেল টিম এবং ত্রান সামগ্রীও পাঠান।

এর কিছু পরেই ঐ ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রের মর্যাদা পায় বাংলাদেশ।উক্ত সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেনঃ ‘পৃথিবী আজ দুইভাগে বিভক্ত। একভাগে শোষক শ্রেণী আরেকভাগে শোষিত। আমি শোষিতের দলে’। এই ভাষনের পর কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেছিলেনঃ ‘তুমি আজ যে ভাষন দিয়েছ, তারপর থেকে সাবধানে থেকো। আজ থেকে তোমাকে হত্যার জন্য একটি বুলেট তোমার পিছু নিয়েছে’।

১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয় । এরপর বিভিন্ন দেশ এবং রাষ্ট্রপ্রধান তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনঃ তারমধ্যে নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ট বলেনঃ ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালীদের আর বিশ্বাস করা যায় না,যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যেকোন জঘন্য কাজ করতে পারে’।

মুক্তিকামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল কাস্ট্রো বলেন: ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে,আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে’।প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রিয় নেতা ইয়াসির আরাফাত বলেছিলেন: ‘আপোষহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট’।

১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে দ্বিতীয় ওআইসি সম্মেলনে যোগ দেন শেখ মুজিবুর রহমান এবং সেই সম্মেলনে ফিলিস্তিনী নেতা ইয়াসির আরাফাতের সাথে সৌহার্দ্য পরিবেশে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় মিলিত হোন তিনি, যা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে সর্বপ্রথম ফিলিস্তিনী কোন সংগঠনের এত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক।

১৯৭৪ সালে পাকিস্তানকে আরব রাষ্ট্রগুলো চাপ দিতে থাকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার জন্য। এরই মধ্যে বাংলাদেশের দরজা উম্মুক্ত করা হয় ফিলিস্তিনের জন্য এবং ঢাকায় পিএলও কে সরকার আমন্ত্রণ জানায় অফিস খোলার জন্য। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকায় পিএলও নেতারা এবং কূটনীতিকরা আসেন এবং ফিলিস্তিনের প্রথম কোন দপ্তর খোলা হয় ঢাকায়।

মুসিলম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের সবসময়ই সহানুভূতি-ভালবাসা ছিল ফিলিস্তিন এবং তার জনগণের জন্য। এ সম্পর্কের আরেক মাইলফলক উম্মোচিত হয় ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে। এ সময় ফিলিস্তিনীদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়ে তা স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রকাশ করে একটি স্মারক ডাকটিকেট যেখানে একজন ফিলিস্তিনী যোদ্ধাকে দেখা যায় অস্ত্র হাতে এবং তার পেছনে কাঁটাতারে ঘেরা মসজিদুল আক্বসা। এই ডাকটিকেটে লেখা ছিলঃ ‘আমরা বীর ফিলিস্তিনী স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের সালাম জানাই’ ।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রনে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত সফরে আসেন পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজে উপস্থিত থেকে লাল গালিচা সংবর্ধনা জানান ফিলিস্তিনী অবিসংবাদিত এই নেতাকে। বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-ভালবাসা এবং ফিলিস্তিন নিয়ে উৎকণ্ঠা দেখে অভিভূত হোন ইয়াসির আরাফাত।

পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যারা এসেছেন,তারা সবাই ফিলিস্তিনীদের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ থেকে শুরু করে, বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা সবাই পূর্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর স্বাধীনতা ঘোষণার পর ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতিদানকারী ১৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

অন্যায়-অবিচার, জুলুম-হত্যা আর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়তে বিভিন্ন সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দাড়িয়েছে ফিলিস্তিনের পাশে। জাপানিজ রেড আর্মি এবং আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির মত বেশ কিছু সংগঠন এবং গেরিলা গোষ্ঠীর সদস্যরা ধর্ম-বর্ণ ভুলে লড়েছিল ফিলিস্তিন মুক্ত আন্দোলনের জন্য।আশির এর দশকে চরম গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনী স্বাধীনতাকামীদের সাথে অস্ত্র হাতে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে লড়াই থেকে শুরু করে অস্ত্র-রসদ বহন করে বাংলাদেশী অনেক যুবক। অনেক তরুণ যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্যও যুদ্ধে অংশ নেন। এই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে গিয়ে অনেক বাংলাদেশি সাহসী তরুণ প্রাণ শাহাদাত বরণ করেন।

১৯৮৮ সালে ইউএস লাইব্রেরী অফ কংগ্রেসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রনে পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাতের তার দ্বিতীয়বারের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ সরকার তাকে জানান যে, বাংলাদেশের প্রায় ৮ হাজার যুবক স্বেচ্ছায় ফিলিস্তিনের জন্য লড়ায় করছে। এছাড়া এই রিপোর্টে আরো জানানো হয় যে ফিলিস্তিনী সশস্ত্র সংগ্রামের বেশ কিছু নেতা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর দ্বারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রদূত শাহের মোহাম্মদ গতকাল ২৩শে এপ্রিল, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ক্রীড়া উন্নয়নে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেছেন। প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি বাংলাদেশে আইসিসি বিশ্বকাপ টোয়েন্টি-২০ সফলভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পাশাপাশি ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য ফিফার সভায় পালেস্টাইনের ফিফার সদস্যভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেছেন। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী প্যালেস্টাইনকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সমর্থন ও সহযোগিতা করার আশ্বাস প্রদান করেছেন।

ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনিদের জন্য লড়াইরত অবস্থায় শহীদ হওয়া বাংলাদেশি সূর্য সন্তানদের আত্মা অন্তত এটুকু জেনে স্বস্তি পাবে যে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নে বাংলাদেশে এখনো জাতীয় মতৈক্য বজায় আছে।জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে যতবার ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি ওঠেছে ততবারই বাংলাদেশ দৃঢ় সমর্থন যুগিয়েছে ফিলিস্তিনকে।আগামীতে ফিলিস্তিনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও উন্নতি হবে বলে আশা করি।

সূত্র: অনলাইন বাংলা

Advertisements

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s