মিডিয়া ও ফিলিস্তিন সম্পর্কে অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা

Posted: July 22, 2014 in ব্লগ
Tags: , ,

লিখেছেন আবু সামীহা

২০০১ সাল। আমি তখন ওকলাহোমা সিটি ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট।  প্রতি সপ্তাহান্তে একটা ডলার স্টোরে কাজ করি। কাজে যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে ট্যাক্সি কল করতে হয়। ওকলাহোমা আমেরিকার সেই অংশে অবস্থিত যেখানে সাদা খৃষ্টান বর্ণবাদীদের আধিপত্য। একদিন ট্যাক্সি আসলে দেখলাম ড্রাইভার সাদা এবং মনে হল তিনি আমাকে দেখে পসন্দ করেন নি।

তিনি আসলে কোন রাখ-ডাক না করে তাঁর অসন্তুষ্টি প্রকাশই করে দিলেন। তিনি বললেন, “আমি মনে করতাম ইমিগ্র্যান্টরা নিউ ইয়র্ক এবং ক্যালিফোর্নিয়াতেই শুধু আসে। তারা এখন ওকলাহোমাতেও আসতে শুরু করেছে।” যাই হোক, হাজার হলেও আমি তাঁর কাস্টমার। তাই আমার সাথে তিনি ফ্রেণ্ডলী হবার চেষ্টা শুরু করলেন। তাই তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কোত্থেকে এসেছেন?” আমি জবাব দেবার আগেই তিনি নিজেই বললেন, “আমাকে অনুমান করতে দিন। আপনি নিশ্চয় ভারতীয়।” আমি দুষ্টামির স্বরে বললাম, “হ্যাঁ, আমার দাদা ভারতীয় ছিলেন, আমার বাবা ছিলেন পাকিস্তানী, আর আমি বাংলাদেশী।” বেচারা পুরো হতভম্ব হয়ে পড়লেন। বললেন, “এটা কী করে সম্ভব যে একই পরিবারের তিনটা পরম্পরা তিনটা ভিন্ন দেশের নাগরিক?”

আমি বললাম, “আসলে আমরা সবাই একই এলাকায় জন্মেছি এবং বড় হয়েছি। আমার বাপ ও দাদা ওখানেই মারা গেছেন। ব্যাপার যা হয়েছে তা হলঃ আমার দাদার সময়ে আমাদের এলাকাটা পুরোটা ভারত ছিল; এরপর আমার বাবার সময়ে দুটো দেশ হয়েছে – পাকিস্তান ও ভারত। আমরা পাকিস্তানের অংশে ছিলাম। পাকিস্তান আবার বিচ্ছিন্ন হয়েছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে। আর আমি জ্ঞান হবার পর যে দেশ দেখেছি তা হল বাংলাদেশ।” তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “বাপরে, বড় জটিল আপনাদের ইতিহাস।”

ভদ্রলোক এখন আমার সাথে কথা বলে স্বাচ্ছন্দ বোধ করছেন। এটা ওটা আরো কিছু কথা বলার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার ধর্ম কী?” মনে রাখতে হবে যে ওকলাহোমা বাইবেল বেল্টের রাজ্য। এর জনশক্তির প্রতি চার জনের একজন বিদেশে মিশনারী কাজে অংশগ্রহণ করে। ওকলাহোমা সিটিকে গীর্জার শহর বললে অত্যুক্তি হবে না। আমি জবাবে বললাম, “ইসলাম।” তিনি ইসলাম বুঝেন না। কী করা যায় তাকে বুঝানোর জন্য? শেষে আমি বললাম, “আমি মুস্লিম।” হুঁ, তিনি  কিন্তু মজলেম চিনেন।  ধারণা করতে পারেন কী রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছে? তিনি পুরো চুপ মেরে গেলেন। আমার সাথে দীর্ঘক্ষণ আর কোন কথাই বললেন না। তার পর হঠাৎ করে বললে উঠলেন, “যারা মানুষ হত্যা করে তাদের সাথে আমার কোন কোন কিছু করার নেই।” চিন্তা করুন, তখনো কিন্তু ৯/১১ এর ঘটনা ঘটে নি। এটা ছিল ২০০১ এর এপ্রিল মাস। যদি ৯/১১ এর পরের ঘটনা হত তাহলে আমার কী অবস্থা হত অনুমান করা যায়?

আমি ভাবলাম ভদ্রলোককে এমনি এমনি ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। তিনি যে দিকে ইঙ্গিত করে ওই কথা বলেছিলেন তা হল ফিলিস্তীন। তখন অধিকৃত ফিলিস্তীনে “শাহাদাত অপারেশন” [MartyrdomOperation] চালাচ্ছিল হামাস। আমি বললাম, “আপনি বোধহয় ফিলিস্তীনীদের আত্মঘাতি অপারেশনের কথা বুঝাচ্ছেন।” তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তাদের কথাই বলছি।”

“কিন্তু আপনি কি কখনো চিন্তা করেছেন তারা কেন এমন করে?”, আমি বললাম।

“কেন তারা এমন করবে? এমন তারা করতে পারে না।  এটা মারাত্মক অন্যায়। তারা মানুষ খুন করছে।”

“কিন্তু আপনার কি চিন্তা করা উচিৎ নয়, কেন কিছু লোক নিজেদের গায়ে বিস্ফোরক বেধে উড়িয়ে দিচ্ছে আর সাথে অন্য কয়েকজনকে হত্যা করছে?”

“আমার এত কিছু চিন্তা করে কাজ নেই। তারা মানুষ হত্যা করছে, এটাই আসল কথা।”

“না, এটাই আসল কথা না। আপনাকে চিন্তা করতে হবে। আপনি কি তাদের ইতিহাস জানেন? এটা তাদের পিতৃ-পুরুষের ভূমি। এখানেই হাজার বছর ধরে তারা বসবাসকরছে। হঠাৎ বাইরে থেকে আসা কিছু লোক তাদের ভূমি দখল করে তাদের উৎখাত করে দিয়েছে। এখন তারা কী করবে?”

“এমন হলে তাদের উচিৎ তাদের নিজেদেরকে গড়া। তাদের ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষিত-কর্মঠ  করে গড়ে তোলা যাতে তারা তাদের ভবিষ্যতকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু তারা অবশ্যই মানুষ খুন করতে পারে না।”

“এটা বলাতো খুব সহজ।তাদেরকে যদি সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে তারা কী করবে?”

“না তাদেরকে চেষ্টা করতেহবে নিজেদের ভবিষ্যত গড়ার জন্য। তার জন্য মানুষ খুন করতে হবে না।”

“এটা ওকলাহোমায় বসে বলা আপনার জন্য খুব সহজ। কিন্তু তাদের বাস্তবতা ভিন্ন। আপনি এখানে নিরাপদে নিজের কাজ নিজে করতে পারেন। সেখানকার ব্যাপারটা এমন নয়।”

“কিন্তু তারা মানুষ খুন করবে কেন?”

“আচ্ছা ধরেন, আমি সমস্যাগ্রস্ত হয়ে আপনার বাড়িতে আসলাম। আপনি আমাকে আশ্রয়ও দিলেন। এরপর আমি আপনার বাড়ি দখল করলাম। তারপর আমার জ্ঞাতিগোষ্ঠি আরো অনেক কে নিয়ে এসে আপনাকে এবং আপনার জ্ঞাতিগোষ্ঠির সবাইকে ভিটে বাড়ী থেকে উৎখাত করলাম; আপনার মা, বাবা, ভাই-বোন, সন্তানাদি, আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করলাম। এখন আপনি কী করবেন?”

কোন দ্বিধা ছাড়াই তিনি বলে ফেললেন, “আমি প্রথম সুযোগেই আপনাকে হত্যা করব।”

আমি বললাম, “ফিলিস্তীনীরা শুধু এ কাজটাই করছে বা করার চেষ্টা করছে।”

তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের সমস্যা হচ্ছে  আমরা ইনফরমেশন পাই টেলিভিশন থেকে।”

 

Advertisements

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s