প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিন: আরও শক্তিশালী হচ্ছে হামাস

Posted: July 27, 2014 in নিবন্ধ
Tags: , , , ,

Hamas-rocketsদ্য ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদার একজন সহযোগী সম্পাদক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক আসা উইন্সটেনলি এ নিবন্ধটি লিখেছেন। তিনি বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। নিবন্ধটি বাংলায় অনুবাদ করেছে অনলাইন বাংলার সহযোগী সম্পাদক সাবিদিন ইব্রাহিম

অন্যান্য দেশের মতও ফিলিস্তিনে ভয়ানক রাজনৈতিক মতভিন্নতা রয়েছে। কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে রক্ষণশীলরা হামাসকে সমর্থন করে, ফিলিস্তিনের ইসলামিক প্রতিরোধ যুদ্ধকে সমর্থন করে। এরকম একটি শহর হচ্ছে হেবরন। অন্যান্য অঞ্চলে ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী ফাতাহ’র শক্তি বেশি। কিছু ছোট ছোট বাম দলের সমর্থনও রয়েছে কয়েক জায়গায়।

কিন্তু এখন আর সে রাজনৈতিক ভিন্নতার জায়গা নেই। এখন ইসরাইলের রক্ত পিপাসু নীতি ফিলিস্তিনি জনগণের জীবন তছনছ করে দিচ্ছে। এখন ফিলিস্তিনি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার একটিই উপায়, সেটা হলো প্রতিরোধ। যেকোন উপায়ে ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিরোধ করা।

গাজায় নিহত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ৭৩ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। এই মুহূর্তে কোন আশার আলো দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসেম ব্রিগেডের প্রতিরোধ ফিলিস্তিনি জনগণের মনোবল চাঙ্গা করতে সাহায্য করছে। গাজায় ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনী তীব্র ও অনমনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যা শত্রু ইসরাইল আশা করে নাই।

স্থল অভিযানে ইসরাইল এত মৃত্যু আশা করে নি। যখন এ লেখাটি তৈরি করছি তখন পর্যন্ত ইসরাইল প্রপাগান্ডিস্টরা এটা স্বীকার করেছে যে স্থল অভিযানে তাদের ৩৫ সেনা মারা গেছে। অবশ্য হামাস এ সংখ্যাটা আরও বেশিই দাবি করছে। মারওয়ান বিশারা নামে ফিলিস্তিনের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক গত সোমবার আল জাজিরাতে একটি আর্টিকেল লেখেন যেখানে হামাস তার বন্ধু ও শত্রুদেরকে বিস্মিত ও হতবিহ্বল করে দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

রবিবার রাতে হামাসের সশস্ত্র শাখার এক মুখপাত্র ঘোষণা করে তারা এক ইসরাইলি সেনাকে আটক করেছে। তারা ঐ সেনার নাম ও আইডি নাম্বার প্রকাশ করে। তবে তারা এটা প্রকাশ করে নাই যে ঐ আহত সেনা জীবিত আছে না মারা গেছে। ইসরাইলি সেনা আটকের এ খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই পশ্চিম তীরের মানুষ রাস্তায় নেমে মিছিল করে। এর ফলে ৫,২৭১ ফিলিস্তিনি বন্দির পরিবার এটা আশা করছে এ সৈন্যের বিনিময়ে তাদের কোনো প্রিয়জন ইসরাইলের কারাগার থেকে মুক্তি পাবে।

প্রথমে জাতিসংঘে ইসরাইলের দূত রন প্রজর ইসরাইলি সেনা আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন। ইসরাইলের দুদিন লেগেছে এটা স্বীকার করতে যে তাদের সেনা অরন শাওল গাজা থেকে নিখোঁজ।

ইসরাইল এটাও আশা করে নাই যে ফিলিস্তিনিদের এই সাধারণ রকেট হামলার প্রভাব এত বেশি হবে। তেল আবিব এয়ারপোর্টের দিকে কয়েকটি রকেট নিক্ষেপের ফল হলো সেখানে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল অনেকটা বন্ধ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল করে দিচ্ছে। এতে বিভিন্ন ইসরাইলি নাগরিক ও পর্যটক আটকা পড়ে আছে। এখন তারা হয়তো বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে ৬৬ বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের কি অনুভব হচ্ছিল।

মার্ক পেরি নামে এক আমেরিকান সাংবাদিক ও ঐতিহাসিক বর্তমান এ অবস্থাকে ‘ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছে। যেসব পশ্চিমা লিবারেলরা সবসময় এই তর্ক করে আসছিলেন যে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের নূন্যতম সশস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অধিকার ভোগ করা উচিত না তারা বর্তমান অবস্থাটা মাথায় রাখতে পারেন। আপনারা আপনাদের প্রোপাগান্ডায় খানিকটা সংশোধন নিয়ে আসতে পারেন। সবচেয়ে বড় সংশোধন আনতে হবে এই কথায় যে ফিলিস্তিনিদের রকেট ‘অকার্যকর’।

মাহমুদ আব্বাস ও এটা মাথায় রাখতে পারেন। কারণ তিনিও প্রথম দিকে রকেট হামলার সমালোচনা করেছিলেন। ‘রকেট হামলা করে তোমরা কি পেতে চাও’ এমন রেটরিক প্রশ্ন করেছিলেন হামাসকে। খুবই লক্ষ্যণীয় হলো তিনি বর্তমানে চুপ মেরে আছেন। কারণ তিনি এটা দেখতে পেরেছেন যে প্রতিরোধের পক্ষে ফিলিস্তিনি জনগণের বিশাল সমর্থন কাজ করছে। এজন্য জনসমর্থনের বাইরে গিয়ে আর কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত আছেন মাহমুদ আব্বাস।

এমনকি লন্ডনে তার রাষ্ট্রদূত ম্যানুয়েল হাসাসিয়ান বিবিসির কাছে স্বীকার করেছে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন বন্ধ ও ‘আত্মরক্ষা’ করার প্রয়োজনেই রকেট নিক্ষেপ করা হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে আমার পরিচিত ফিলিস্তিনিদের সাথে কথা বলে জেনেছি যে এমন কোন ফিলিস্তিনি নেই যারা গাজায় প্রতিরোধকে সমর্থন করেনা। গাজায় প্রতিরোধ তাদের দেশের জনগণের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ী ঘটনা হিসেবে কাজ করেছে।

হামাস নেতা খালেদ মেশাল দোহায় একটি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন যে তারা এখন ব্যাকগ্রাউন্ডে আছেন এবং হামাসের সশস্ত্র শাখাই প্রতিরোধ যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফিলিস্তিনি জনগণ হামাসের রক্ষণশীল মূল্যবোধের মাধ্যমে একত্রিত নয় বরং সশস্ত্র শাখার প্রতিরোধের মাধ্যমে একত্রিত।

মেশাল এটাও পরিস্কার করে দেন যে গাজায় ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা নৈতিকভাবে কত এগিয়ে আছে। যেখানে ইসরাইলি সেনারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশু ও নারীদেরকে হত্যা করছে, জাতিসংঘ স্কুলে আশ্রয় নেয়া শিশুদেরকে হত্যা করছে সেখানে ফিলিস্তিনিরা এই রক্তপিপাসু ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ করছে।

শুধু লাশের হিসাব করলেই পার্থক্যটা পরিস্কার হয়ে যাবে কারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কারা অন্যায্য মানুষ হত্যা করছে। ৭ জুলাই শুরু হওয়া সামরিক হামলার পর থেকে এখন পর্যন্ত(শনিবার) ৮৮১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের মতে এর ৭৩ ভাগই বেসামরিক নাগরিক। কমপক্ষে ২০০ ফিলিস্তিনি শিশু রয়েছে এর মধ্যে।

এটা পরিস্কার যে ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবেই বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক স্থাপনার উপর এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে শুধু ইসরাইলি সামরিক স্থাপনাতেই হামলা করে আসছে। (যদিও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কৃতদাসসুলভ মিডিয়াগুলো ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বরাতে প্রপাগান্ডা চালিয়ে আসছে।)

জাতিসংঘের দেয়া একই তথ্য অনুসারে ৩৭ জন ইসরাইলি নিহত হয়েছে যার মধ্যে ৩৫ জনই সেনা যারা সরাসরি গাজায় সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল।

ইসরাইল তাদের নিবেদিতপ্রাণ আমেরিকান ও ইউরোপীয় বন্ধুদেরকে ধন্যবাদ জানাতেই পারে। কারণ তারা সবসময় ইসরাইলের প্রতি শর্তহীন সমর্থন অব্যহত রাখছে। ইসরাইলের হাতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে যেগুলো সব বেসামরিক পরিবারগুলোকে শেষ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ। কিন্তু যখনই যুদ্ধ ময়দানে নামে তখন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ শক্তিশালী অবস্থানে থাকে। গাজায় তাদের পরিবার ও বাড়িঘর রক্ষা করা ছাড়া তাদের কোন গতি নেই। তাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই।

ফিলিস্তিনিদের এই প্রতিরোধ ইসরাইলকে বেশ নাকানিচুবানি দিচ্ছে। খুব শীঘ্রই ইসরাইল এটা ভুলতে পারবেনা। এটা সত্য যে ইসরাইল নিয়মিতভাবে ফিলিস্তিনিদেরকে হত্যা করে আসছে। কিন্তু বিশ্ব মিডিয়ায় কোনরূপ আলোচনা বাদ রেখেই গাজাতে সময়ে সময়ে এ হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আসছে। পাশ্চাত্য মিডিয়ার নজর গাজাতে পড়ে যখন গাজা প্রতিরোধ শুরু করে।

গাজায় ইসরাইলি সেনাদের এক ঐতিহাসিক পরাজয়ের প্রক্রিয়ায় কাজ করছে হামাস। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর সাথে ইসরাইলিদের যে পরাজয়ের স্মৃতি আছে এটা সে পরিমাণের না হলেও ইসরাইল এ স্মৃতি দীর্ঘদিন ভুলতে পারবে না।

Advertisements

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s