গাজা থেকে বলছি: আমি কি যথেষ্ট মানুষ নই?

Posted: August 5, 2014 in ব্লগ
Tags: , , ,

abumorrশিরোনামের প্রশ্নটি করেছেন গাজা ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, ফিলিস্তিনি ব্লগার ও মানবাধিকারকর্মী মাইসাম আবুমরআলজাজিরার মতামত বিভাগে প্রকাশিত মাইসামের পাঠানো এই চিঠিতে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন, এই চিঠি তারও শেষ চিঠি হতে পারে। এটি অনুবাদ করেছেন গাউস রহমান পিয়াস

মনে পড়ছে গাজায় আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক আইসিআরসির এক কর্মশালায় একজন ফিলিস্তিনি প্রশ্ন করেছিলেন : ‘কী কী যোগ্যতা থাকলে এই মানবাধিকারগুলো আমিও পাব?’ ‘কিচ্ছু না। আপনাকে মানুষ হতে হবে, এইটুকুনই।’ তেমন না ভেবেই উত্তর দিয়েছিলেন প্রশিক্ষক

আজ আমিও প্রশ্ন করছি, মানুষ হিসেবে গণ্য হতে হলে আমাকে কী করতে হবে? কী হতে হবে? আমার জীবনও তো স্বাভাবিক মানুষের মতোই! আমি ভালোবাসি। ঘৃণা করি। কাঁদি। হাসি। আমি ভুল করি। শিখি। আমি স্বপ্ন দেখি। আঘাত দিই। আঘাত পাই। পিৎজা আমার খুব পছন্দ। টাইটানিক ছবিটি দেখেছি ছয়বার। ব্যাডলি কুপারের জন্য পাগল। আমার অসুখ হয়। কখনো এমন সস্তা কৌতুক করি যে নিজেরই হাসি পায় এবং সর্বশেষ যেদিন নিজেকে আয়নায় দেখেছিলাম আমাকে মানুষের মতোই দেখাচ্ছিল।

তফাত শুধু এটুকুনই যে দখলদার একটি দেশ একদিন কোত্থেকে এসে দাবি করে আমার মাতৃভূমির একচ্ছত্র মালিকানা; যে ভূমিতে আমার পূর্বপুরুষরা বংশপরম্পরায় বহুকাল আগে থেকেই বসবাস করে এসেছে। এরপর এই দখলদার দেশটি আমার জনগণকে নৃ-তাত্ত্বিকভাবে নির্মল করতে লেগে গেল।

আমার একমাত্র পাপ, আমি প্রতিবাদ করেছি, লড়েছি আমার হারানো মাতৃভূমির জন্য এবং যা যা আমার প্রিয়- সব কিছুর জন্য। জগৎ আমার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনল, আমার অপরাধ আমি বলেছি, ইতর প্রাণীদের মতো মারা পড়ব না। কিন্তু ইতর প্রাণীরাও তো প্রাণের জন্য লড়াই করে!

যুক্তরাষ্ট্রের কথা আমি মানলাম এবং নির্বাচনে গেলাম; সব দিক দিয়ে পছন্দ- এমন একটি দলকেই ভোট দিলাম। কিন্তু আমাকে দণ্ড দেওয়া হলো তাদেরই শেখানো সেই গণতন্ত্রচর্চা করার অপরাধে। আমি বুঝতে পারিনি গণতন্ত্রের আধুনিক সংজ্ঞা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত দলকে ভোট দেওয়া, বেশির ভাগ ভোটার যাকে ভোট দেয় সে দলকে ভোট দেওয়া নয়। শাস্তি হিসেবে আমাকে দুর্ভেদ্য অবরোধে নিক্ষেপ করা হলো, পুরে দেওয়া হলো না খাইয়ে মারার নীলনকশায়, সালের পর সাল বন্দি রাখা হলো তাবৎ দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন, ক্ষুদ্র এক ভূখণ্ডে।

এরই মধ্যে আমি শেষ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা, সে জন্য মোমের আলোয় নিতে হয়েছিল পরীক্ষার প্রস্তুতি, গবেষণার পুরো লেখাই লিখতে হয়েছিল হাতে। স্কুলজীবনে সারাটা দিন আমাকে অভুক্ত থাকতে হয়েছে অর্থাভাবে কোনো খাবার কিনতে পারিনি বলে; কারণ আমার প্রকৌশলী বাবার জন্য কিছুই ছিল না নির্মাণ করার মতো। স্নাতক করার সময় চারটি বছর গেল কী ব্যস্ততায়! অনেক স্বপ্ন দেখতাম তখন, কিন্তু সেগুলো ছিল আমার বাস্তবতার চেয়ে ঢের বড়। যোগ্যতার বিচারে অমিত সম্ভাবনা থাকার পরও জোটেনি কোনো চাকরি।

মৌলিক অধিকার বলে চিনি-জানি- এমন কিছুর জন্য আমি প্রতিবাদ করলাম, লড়লাম; আর জগৎ একে বলছে সন্ত্রাসবাদ। আমার যে গাজা জর্জরিত হলো দারিদ্র্য ও বিচ্ছিন্নতায়- সেখানে এক দশকেরও কম সময়ে দখলদার ইসরায়েল তিনটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধাল; তাদের বাহিনীর দাঁত পর্যন্ত গণবিধ্বংসী অস্ত্রে সজ্জিত, যে অস্ত্র খরিদ করা হচ্ছে মার্কিন জনগণের করের পয়সায়। যেই আমি খুবই নাজুক, হাস্যকর, হাতে তৈরি অস্ত্র নিয়ে রুখে দাঁড়ালাম; দুনিয়া আবারও প্রশ্ন করল- কেন এই প্রতিবাদ? হিসাব করে প্রতিদিন আমার কয়েক শ মানুষ মারা হচ্ছে এবং আমি দেখছি আমার শৈশব, আমার তারুণ্য অপচয় হয়ে গেছে বেদনায়, অতীব দুর্দশায়। দুনিয়া এর পরও আমার ললাটে সন্ত্রাসীর তকমা এঁকে দিচ্ছে। আমি একজন সন্ত্রাসবাদী, কারণ আমি যুদ্ধ করছি আমার মৌলিক অধিকারগুলোর জন্য; যখন অন্যরা তা মেনে নিয়েছে এক ফোঁটা রক্তও না ঝরিয়ে এবং মানবেতর কোনো পরিস্থিতিতে না পড়ে।

এবারও আমার এ ছোট্ট জীবন থেকে ২৭টি দিন লুটে নেওয়া হলো; কিন্তু কথা ছিল এই দিনগুলো হবে আমার জীবনের মুধরতম সময়। দিনগুলো আমি কাটিয়েছি প্রিয়জনের খুন হওয়া দেখে দেখে, কারণ তারা জগতের চোখে যথেষ্ট মানুষ নয়। নিজের কর্মজীবন গড়ার বদলে আমাকে এখন আরো অনেক বছর কাটাতে হবে বর্বরতার এই দুঃসহ স্মৃতি ভোলার অপেক্ষায়।

এই যুদ্ধে আমি নাও বাঁচতে পারি, তাই বিশ্বকে বলে যেতে চাই যে আমি স্বচক্ষে কখনো কোনো রকেট দেখিনি, আমার ঘরেও কোনো রকেট মজুদ করিনি। আর কেউ আমাকে মানব ঢালও করেনি। লেখাটি যখন লিখছি মা আমার বাবাকে বলছিলেন যে রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। পানি ও বিদ্যুৎ তো অনেক দিন ধরেই নেই। আমি আজও জানি না, কেন এ ধরনের নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে, আমার কোন অপরাধে? ভাবছি, কেউ মানুষ হলে তার অনুভূতিগুলো কেমন হয়।

অনুবাদ সূত্র: কালেরকণ্ঠ

Advertisements

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s