যুদ্ধের সমীকরণ: বিজয়ী হামাস

Posted: August 20, 2014 in নিবন্ধ
Tags: , , , , ,

লিখেছেন জাহিদ রাজন

১৯৭৩ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলি সেনারা ট্যাঙ্ক নিয়ে অগ্রসর হল। তারা ভাবল যে মিশরের সেনারা যেহেতু সুয়েজ খাল অতিক্রম করে এসেছে তাই খুব বেশী ভারী অস্ত্র এখনো আনতে পারে নি। অতএব, ট্যাঙ্ক দিয়ে আক্রমণ করে মিশরের সেনাবাহিনীকে সহজেই পরাজিত করা যাবে। ইসরাইল ট্যাঙ্ক নিয়ে প্রায় বিনা বাধায় অনেকখানি সামনে চলে আসল। মিশরের সেনাবাহিনী অপেক্ষা করতে থাকল। যখন ইসরাইলি ট্যাঙ্ক কিছুটা কাছাকাছি রেঞ্জে আসল তখন মিশরের সেনাবাহিনী রাশিয়া থেকে আনা এন্টিট্যাঙ্ক মিসাইল ফায়ার করা আরম্ভ করল। পরের দিকে বেশ ভালভাবে সামলে উঠলেও প্রথমে এই এন্টিট্যাঙ্ক মিসাইলের বাধায় ইসরাইলের বেশ কিছু সেনা নিহত হল এবং ট্যাঙ্ক ধ্বংস হল। এ ঘটনায় ইসরাইল বেশ হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে একটা জিনিস খেয়াল রাখা দরকার। ইসরাইলের একজন সেনা নিহত হওয়াটাকেও ইসরাইলিরা খুব গুরুত্ব সহকারে দেখে। নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করলে ১৯৭৩ সালের আরব ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলের পারফরম্যন্স ছিল অসাধারণ। মিশর এবং সিরিয়ার অতর্কিতে হামলার মুখোমুখি হয়েও তারা শেষ পর্যন্ত সিরিয়াকে বেশ ভালভাবেই কাবু করেছিল। সম্মিলিত আরব ফোর্স যুদ্ধে যোগ না দিলে হয়ত ইসরাইল দামেস্ক দখল করে ফেলত ।

মুখের কথা দিয়ে যুদ্ধে জয়ে চ্যাম্পিয়ন আনোয়ার সাদাত যতই যুদ্ধে বিজয়ের ঘোষণা দেন না কেন, আসলে মিশরের সেনাবাহিনীকেও চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। তবে সাদাতের উদ্দেশ্য ছিল ইসরাইলের সাথে আলোচনা আরম্ভ করা। সাদাত সেটা করতে পেরেছিলেন। আর হাফেজ আল আসাদের জন্য এটা ছিল একটা ব্যক্তিগত ইগোর পরীক্ষা। কেননা ৬৭ সালের যুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এবং যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য তাকে দায়ী করেছিল বাথ পার্টির মিলিটারি কমিটির সদস্যরা।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ড মায়ার-এর জন্য এরচেয়ে ভাল আর কিছু করা সম্ভব ছিল না বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। একজন মহিলা হয়েও এরকম একটা যুদ্ধ তিনি সামলে নিয়েছিলেন। তারপরেও ইসরাইলি সেনা মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী গোল্ডমায়ারকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।

ওই যুদ্ধে অনেক ট্যাঙ্ক ধ্বংস এবং সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরাইল শক্তিশালী ট্যাঙ্ক নির্মাণে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। তারা তৈরি করে মারাকাভা ট্যাঙ্ক। জেনারেশন-১ এর পর ধীরে ধীরে এতে যোগ হয় জেনারেশন-২ এবং জেনারেশন-৩। তারা দাবি করে এটাই বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ট্যাঙ্ক যেখানে একজন সৈন্য সবচেয়ে নিরাপদ। পাশাপাশি এটি এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইলের বিপক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। তারা তাদের এই ট্যাঙ্কের বিভিন্ন অংশের ছবি ইন্টারনেটেও দিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য ছিল নিজদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করা।

২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধের বেশ কিছু দিন আগে থেকেই হিজবুল্লাহ পরিকল্পনা করেছিল। তারা পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে দুইজন ইসরাইলি সেনাকে অপহরণ করে। এরপর ইসরাইল তাদেরকে উদ্ধারে রুটিন ওয়ার্ক শুরু করে। পাঠায় বেশ কিছু মারাকাভা ট্যাঙ্ক। উদ্দেশ্য ট্যাঙ্ক দিয়ে আক্রমণ করে হিজবুল্লাহকে ব্যস্ত রাখা। এরপর ইসরাইলের সেনা পাঠিয়ে অপহরণকৃত সেনাদের উদ্ধার করা।

হিজবুল্লাহ ইসরাইলের ট্যাঙ্কের গোলার জবাবে রকেট হামলা করে। এবারে ইসরাইলের সেনারা ট্যাঙ্ক নিয়ে লেবাননে প্রবেশ করে। হিজবুল্লাহ কিছু পরিকল্পিত জায়গা থেকে রকেট ছুড়ছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল সেসব জায়গা দিয়ে যেন ইসরাইলি ট্যাঙ্ক প্রবেশ করে। আসলে ইসরাইল এটা করে হিজবুল্লাহর আঁকা ছকে পা দেয়। হিজবুল্লাহ লম্বা সময় ধরে বিভিন্ন জায়গায় সুড়ঙ্গ খনন করে এবং সেখানে খাবার-রসদ এবং অস্ত্রের মজুদ রাখে। এছাড়া সে জায়গাগুলো ছিল পাহাড়ি এলাকা, যেখান দিয়ে ট্যাঙ্ক সহজে ঢুকতে পারছিল না। ট্যাঙ্ক যখন রাস্তা দিয়ে ঢুকছিল হিজবুল্লাহার গেরিলারা এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল ফায়ার করে।

ইন্টারনেটে ছবি দেখে তারা মারকাভা ট্যাঙ্ক নিয়ে গবেষণা করে এবং কোথায় গোলা ছুঁড়লে সবচেয়ে সহজে এই ট্যাঙ্ক ধ্বংস করা যাবে সেটা তারা আবিস্কার করেছিল। যেহেতু তারা ট্যাঙ্ক কোন কোন জায়গা দিয়ে ঢুকবে সেটা জানত তারা আগে থেকেই সেখানে সুড়ঙ্গ তৈরি করে রাখে এবং খুব কাছ থেকে এন্টি ট্যাঙ্ক মিসাইল ফায়ার করে। কোন কোন ক্ষেত্রে মাত্র ১০০ মিটার দূর থেকে এন্টি ট্যাঙ্ক মিসাইল ফায়ার করে। এতে প্রায় ৪৯ টি ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়।

যা বলার জন্য এত কথা বললাম সেটা হল, একজন ইসরাইলি সামরিক বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন, আমি খুব ভালমত জানি মারকাভা ট্যাঙ্ক কতটা শক্তিশালী। কিন্ত আপনি যদি অর্ধেক শহীদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, যে নিজে মরতে এসেছে, তখন যুদ্ধে জেতা খুব কঠিন। অল্প অস্ত্র নিয়েও এরকম প্রতিপক্ষ বড় রকমের ক্ষতি করতে পারে। লেবানন যুদ্ধ ইসরাইলের জন্য ছিল একটা বড় শিক্ষা। ইসরাইলের সেনাদের মনোবল সে যুদ্ধে কম ছিল।

গত্কাল একজন ইসরাইলি সেনার বক্তব্য পড়লাম যার মূল কথা ছিল- হামাসের মুখোমুখি হয়ে এ যুদ্ধে তারা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে। মিডল ইস্ট মনিটর লিখেছে এভাবে- “Israeli soldiers described the situation under Al-Qassam fire in the Gaza village of Al-Atatreh similar to that of “sitting ducks” in a “shooting field”.

আসলে যুদ্ধ কেবল মাত্র একটা অস্ত্রের খেলা না, এরচেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটা মনোবল, সাহস আর বুদ্ধিরও খেলা। এত সীমিত উপকরণ নিয়ে সামর্থ্যের দিক থেকে প্রথম দিকের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হামাসের পারফরম্যন্স নিঃসন্দেহে অসাধারণ ছিল। তাদের মনোবল এবং দৃঢ়তার কারণে তারা ইসরাইলের সেনাদেরকে মানসিকভাবে ভালই কোণঠাসা করেছে। আমি বিশ্বাস করি একটু ভাল নেগসিয়েশন করতে পারলে একটা ভাল ডিল হবে।

হ্যাঁ, এটা একটা অসম যুদ্ধ কিন্তু অত্যাচারী দখলদারের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রাম শক্তিমত্তার ইকুয়েশন মেনে চলে না। ফিলিস্তিনের প্রায় ২২০০’র মত মানুষ নিহত হয়েছেন, অনেক মানুষ গৃহহারা হয়েছে যেটা পূর্বের সব আক্রমণেই হয়েছে। তবে ইসরাইল এর ৬৪ সেনা নিহত হওয়ার ব্যপারাটা এবারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ২০০৬ সালের পর এটা ইসরাইলের জন্য আরও একটা বড় শিক্ষা।

আমি মনে করি এ যুদ্ধের বিজয়ী হামাস।

Advertisements

আপনার মন্তব্য লিখুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s